মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

মুক্তিযোদ্ধা ভাতা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ - ১৯৭১ যুদ্ধকৌশল ও সামরিক শক্তির বিন্যাস

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাময় অথচ সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।' ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাত থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গোটা বাংলাদেশ জুড়ে এমন এক নারকীয় গণহত্যা এবং অকল্পনীয় নৃশংসতা চালিয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যা পৃথিবীর আর কোথায়ও ঘটেনি।

এই গণহত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে সেদিন রুখে দাঁড়িয়েছিল গোটা বাঙালি জাতি। দখলদারদের বিরুদ্ধে তারা অগণিত চোরাগুপ্তা হামলা পরিচালনা করেছিল যা হানাদার পাকিস্তানীদের দিশেহারা করে তোলে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করে বসলে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনী ক্ষিপ্রতার সঙ্গে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তান সৈন্যদের উপর। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ আর গেরিলা যোদ্ধাদের সহায়তায় যৌথবাহিনী মাত্র ১২ দিনের যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানী সৈন্যদের আত্মসমর্পনে বাধ্য করে। ফলে বিশ্বমানচিত্রে অভ্যূদয় ঘটে একটা নতুন রাষ্ট্রের, যার নাম বাংলাদেশ। নয় মাসের যুদ্ধে প্রায় তিরিশ লক্ষ বাঙালিকে জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছিল - দেশান্তরী হয়ে প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো আরও এককোটি বাঙালি। পাকিস্তানিদের পৈশাচিকতার শিকার হয়েছিল লক্ষ কোটি নিরপরাধ নারী-পুরুষ-শিশু।

এমন একটা অবিশ্বাস্য গণহত্যা ও নির্যাতন - যা প্রায় প্রতিটি বাঙালি ও তাদের পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত্র করেছে, প্রভাব ফেলেছে প্রতিবেশি দেশ ভারত ছাড়াও বিশ্বের প্রতিটি দেশের মানুষের মনে-তেমন ব্যাপক যুদ্ধে অসংখ্য ঘটনা ঘটবে স্বাভাবিক ভাবেই। শৌর্য, বীর্য ও অসাধারণ বীরত্ব গাঁথার বহু কাহিনীর সৃষ্টি হবে। তবে এটা দুঃখজনক যে এসব ঘটনার অনেকগুলোই সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি। কিছু ঘটনা অনেক বিকৃত হয়েছে। যেহেতু যুদ্ধের শুরুতে কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা সংগঠনের অস্তিত্ব ছিলো না এবং পরবর্তীকালে নেতৃত্ব সংগঠিত হলেও যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে যাচ্ছিলো অনিয়ন্ত্রিত ভাবে, তাই বহু ঘটনার সঠিক লিপিবদ্ধকরণ সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ফলে যুদ্ধের কিছু কিছু বিষয়ে নানা ধরনের অসঙ্গতি সুস্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। অনেকগুলো ঘটনার ব্যাপারে প্রচলিত কিছু কাহিনী সত্য বিবর্জিত। এবং সেই অসঙ্গতি দূর করার কোনো পদক্ষেপও নেয়া হয়নি। ফলে সত্যকে প্রতিষ্ঠার কাজ এখনও সফল হয়নি। এক্ষেত্রে ঐতিহাসিকগণ, বিশেষতঃ সামরিক ইতিহাসবিদগণ যাচাই বাছাই করে বিদ্যমান অসত্যের জাল ছিনড়ব করে প্রকৃত সত্যকে তুলে ধরবেন- এটাই সময়ের দাবী। মুক্তিযুদ্ধের বেশ কয়েকজন সমরনায়ক এবং সংগঠক ও রাজনীতিবিদ এখনও জীবিত থাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পনড়ব করার সুযোগ এখনও রয়েছে। বিশেষতঃ যুদ্ধকালে গোটা দেশকে সেক্টর ভিত্তিক বিভাজন, মুক্তিবাহিনী প্রধান সহ বিভিনড়ব সেক্টর কমান্ডারদের নিয়োগ এবং যুদ্ধনীতি ও যুদ্ধ কৌশল নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস বস্ত্তনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।

যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো বিভিন্ন বাঙালি সেনাকর্মকর্তার অসংগঠিত স্বল্পপরিকল্পিত বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। এইসব বাঙালি সামরিক অফিসারগণ তাঁদের অধিনস্ত বাঙালি সৈন্যদের নিয়ে প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন কোনরূপ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা সমন্বয় ছাড়াই। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হবার পরেই গোটা যুদ্ধটা সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ আসে। এ উদ্দেশ্যে সেসময় বিচ্ছিনড়বভাবে যুদ্ধরত সামরিক কমান্ডারদের সম্মেলন আহবান করা হয় কলকাতায় ৮ থিয়েটার রোডের (বর্তমানে শেক্সপিয়ার সরণী) এক বাড়িতে। বাড়ীটি ছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ এর একটি অফিস, যা যুদ্ধকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। সম্মেলন চলে একাত্তরের ১১ থেকে ১৭ই জুলাই পর্যন্ত । প্রতিদিন সকালে শুরু হয়ে আলোচনা চলতো অনেক রাত পর্যন্ত।

প্রথম দিনের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ। যুদ্ধকালীন সশস্ত্র বাহিনী সমূহের প্রধান কর্ণেল (অবঃ) এম. এ. জি. ওসমানী সম্মেলনের প্রম দিন অনুপস্থিত ছিলেন। এই সম্মেলনে বিভিনড়ব অধিবেশনগুলিতে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা হচ্ছেন -
১। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ।
২। কর্ণেল (অবঃ) (পরবর্তীকালে, জেনারেল) এম. এ. জি. ওসমানী।
৩। লেঃ কর্ণেল (পরবর্তীকালে, মেজর জেনারেল) এম. এ. রব।
৪। গ্রুপ ক্যাপ্টেন (পরবর্তীকালে, এয়ার ভাইস মার্শাল) এ. কে. খন্দকার।
৫। মেজর (পরবর্তীকালে, লেঃ কর্ণেল) কাজী নুরুজ্জামান।
৬। মেজর (পরবর্তীকালে, মেজর জেনারেল) সি. আর. দত্ত।
৭। মেজর (পরবর্তীকালে, মেজর জেনারেল) কে. এম. শফিউল্লাহ।
৮। মেজর (পরবর্তীকালে, লেঃ জেনারেল) জিয়াউর রহমান।
৯। মেজর (পরবর্তীকালে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) খালেদ মোশাররফ।
১০। মেজর (পরবর্তীকালে, লেঃ জেনারেল) মীর শওকত আলী।
১১। উইং কমান্ডার (পরবর্তীকালে, এয়ার ভাইস মার্শাল) এম. কে. বাশার।
১২। মেজর (পরবর্তীকালে, লেঃ কর্ণেল) আবু ওসমান চৌধুরী।
১৩। মেজর এ. আর. চৌধুরী।
১৪। ক্যাপ্টেন (পরবর্তীকালে মেজর) রফিকুল ইসলাম।
১৫। ক্যাপ্টেন (পরবর্তীকালে, মেজর) এম. এ. জলিল।
সম্মেলনে যুদ্ধের বিভিনড়ব দিক, যুদ্ধক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যাদি ও ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এই সম্মেলনে লেঃ কর্ণেল এম. এ. রবকে চীফ অফ স্টাফ এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকারকে ডেপুটি চীফ অফ স্টাফ পদে নিয়োগের ঘোষণা করা হয়।

যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সেগুলো হচ্ছে -
১। সেক্টরে সমূহের সীমানা নির্ধারণ।
২। গেরিলা যোদ্ধাদের সংগঠিত করা।
৩। 'নিয়মিত বাহিনী' সংগঠিত করা।
পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে দীর্ঘ মেয়াদি স্ট্র্যাটেজি হিসাবে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত সমূহ গ্রহণ করা হয় -

ক) সর্বত্র দখলদার বাহিনীর উপর ক্ষিপ্র আক্রমণ ও চোরাগোপ্তা হামলার জন্য স্বল্পমাত্রার প্রশিক্ষণ দিয়ে বিপুল সংখ্যক গেরিলা যোদ্ধাদের দেশের অভ্যন্তরে পাঠানো।
খ) কলকারখানা যেন চলতে না পারে সেজন্যে বিদ্যুতের খুঁটি ও স্টেশনগুলি উড়িয়ে দেয়া।
গ) পূর্বাঞ্চল থেকে কোনপ্রকার কাঁচামাল বা তৈরি পণ্য পাকিস্তানীদের রপ্তানি করতে না দেয়া এবং তা করা হবে বন্দরের কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং বন্দরের মালগুদামগুলি ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে।
ঘ) পাকিস্তানী সৈন্যদের চলাচলে ব্যবহৃত সকল প্রকার যানবাহন, রেল এবং নৌযান সহ সেনা রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা ক্রমাগত আক্রমণ ও ধ্বংস করে দেয়া।
ঙ) শত্রুদলের কেন্দ্রীভূত শক্তিকে বিকেন্দ্রীকরণে বাধ্য করার মতো কৌশলগত পরিকল্পনা নেয়া-যাতে করে গেরিলা যোদ্ধারা শত্রু সেনার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলের উপর অনায়াসে আক্রমণ চালিয়ে ওদের নিশ্চিহ্ন করতে পারে।
এছাড়া কৌশলগত কারণে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে (১০টি ভৌগলিক অঞ্চল এবং একটি অঞ্চলবিহীন বিশেষ সেক্টর) ভাগ করা হয়। সেক্টরগুলি ছিলো নিম্নরূপ -



১ নং সেক্টরঃ১ নং সেক্টরঃ১ নং সেক্টরঃ

ক) এলাকাঃ বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং নোয়াখালী জেলার কিছু অংশ (মুহুরী নদীর পূর্ব অঞ্চল)।
খ) সাব-সেক্টরের সংখ্যাঃ ৫। গ) সেক্টরবাহিনী সদস্য সংখ্যাঃ ২,১০০ যার মধ্যে ১,৫০০ ইপিআর সদস্য, ২০০ পুলিশ, ৩০০ সেনাসদস্য এবং ১০০ নৌ ও বিমান বাহিনী সদস্য।
ঘ) গেরিলা সংখ্যাঃ ২০,০০০। যার মধ্যে ৮,০০০ জনকে সংগঠিত করা হয়েছিলো বিভিনড়ব দলে। ৩৫ শতাংশ গেরিলা এবং সেক্টরবাহিনীর সবাইকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হয়।
ঙ) সেক্টর কমান্ডারঃ ক্যাপ্টেন (পরবর্তীকালে, মেজর) রফিকুল ইসলাম।
২ নং সেক্টরঃ

ক) এলাকাঃ ফরিদপুরের পূর্ব অঞ্চল, ঢাকা জেলার দক্ষিণাঞ্চল ও ঢাকা শহর, কুমিল্লা জেলা (আখাউড়া-আশুগঞ্জ রেল লাইনের পূর্ব অংশ ব্যতিত) এবং নোয়াখালী জেলা (মুহুরী নদীর পূর্ব অঞ্চল ব্যতিত)।
খ) সাব-সেক্টরের সংখ্যাঃ ৬।
গ) সেক্টরবাহিনী সদস্য সংখ্যাঃ ৪,০০০।
ঘ) গেরিলা সংখ্যাঃ ৩০,০০০।
ঙ) সেক্টর কমান্ডারঃ মেজর (পরবর্তীকালে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) খালেদ মোশাররফ।
৩ নং সেক্টরঃ

ক) এলাকাঃ কুমিল্লা জেলার কিছু অংশ (আখাউড়া-আশুগঞ্জ রেল লাইনের উত্তর অংশে), সিলেট জেলার কিছু অংশ (চুরামনিকাটিলাখাই-শায়েস্তাগঞ্জ অক্ষের দক্ষিণ অংশ), ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ সাব-ডিভিশন ও ঢাকা জেলার উত্তরাঞ্চল।
খ) সাব-সেক্টরের সংখ্যাঃ ১০। গ) সেক্টরবাহিনী সদস্য সংখ্যাঃ প্রায় ২,৫০০। ঘ) গেরিলা সংখ্যাঃ ২৫,০০০।
ঙ) সেক্টর কমান্ডারঃ মেজর (পরবর্তীকালে, মেজর জেনারেল) কে. এম. শফিউল্লাহ্।
৪ নং সেক্টরঃ

ক) এলাকাঃ সিলেট জেলার নিম্নোক্ত অঞ্চল সমূহ -
১. পশ্চিম সীমান্তঃ তামাবিল-আজমিরিগঞ্জ-লাখাই অক্ষ।
২. দক্ষিণ সীমান্তঃ লাখাই-শায়েস্তাগঞ্জ অক্ষ।
খ) সাব-সেক্টরের সংখ্যাঃ ৬।
গ) সেক্টরবাহিনী সদস্য সংখ্যাঃ ২,০০০।
ঘ) গেরিলা সংখ্যাঃ ৮,০০০।
ঙ) সেক্টর কমান্ডারঃ মেজর (পরবর্তীকালে, মেজর জেনারেল) সি. আর. দত্ত।
৫ নং সেক্টরঃ

ক) এলাকাঃ তামাবিল-আজমিরিগঞ্জ অক্ষ বরাবর সিলেট জেলার পশ্চিমের বাকি অংশ।
খ) সাব-সেক্টরের সংখ্যাঃ ৬।
গ) সেক্টরবাহিনী সদস্য সংখ্যাঃ ৮০০।
ঘ) গেরিলা সংখ্যাঃ ৭,০০০।
ঙ) সেক্টর কমান্ডারঃ মেজর (পরবর্তীকালে লেঃ জেনারেল) মীর শওকত আলী।
৬ নং সেক্টরঃ

ক) এলাকাঃ যমুনার পশ্চিমে রংপুর ও দিনাজপুর জেলা, রাণীশঙ্কাইল-পীরগঞ্জ-বীরগঞ্জ লাইনের উত্তরাংশ ও রংপুর জেলার পীরগঞ্জ-পলাশবাড়ী লাইনের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল নিয়ে এ সেক্টর গঠিত হয়েছিল। দিনাজপুরের রাণীশঙ্কাইল, পীরগঞ্জ, বীরগঞ্জ ও রংপুরের পীরগঞ্জ, পলাশবাড়ী ৭ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো।
খ) সাব-সেক্টরের সংখ্যাঃ ৫।
গ) সেক্টরবাহিনী সদস্য সংখ্যাঃ ১,২০০।
ঘ) গেরিলা সংখ্যাঃ ৬,০০০।
ঙ) সেক্টর কমান্ডারঃ উইং কমান্ডার (পরবর্তীকালে, এয়ার ভাইস মার্শাল) এম. কে. বাশার।
৭ নং সেক্টরঃ

ক) এলাকাঃ সমগ্র রাজশাহী, পাবনা ও বগুড়া জেলা, দিনাজপুর ও রংপুরের অংশবিশেষ (দিনাজপুরের রাণীশঙ্কাইল-পীরগঞ্জ লাইনের দক্ষিণাংশ ও রংপুরের পলাশবাড়ী-পীরগঞ্জ লাইনের দক্ষিণাংশ।
খ) সাব-সেক্টরের সংখ্যাঃ ৮।
গ) সেক্টরবাহিনী সদস্য সংখ্যাঃ ২,০০০।
ঘ) গেরিলা সংখ্যাঃ ১০,০০০।
ঙ) সেক্টর কমান্ডারঃ মেজর (পরবর্তীকালে লেঃ কর্ণেল) কিউ. এন. জামান।
৮ নং সেক্টরঃ

ক) এলাকাঃ কুষ্টিয়া ও যশোহরের সমগ্র এলাকা, ফরিদপুর জেলার অংশবিশেষ, খুলনা জেলার সাতক্ষীরা মহকুমা। সীমানাঃ উত্তরে পদ্মা নদী। পদ্মা-যমুনার মোহনা থেকে মাদারীপুর পর্যন্ত এর পূর্ব সীমান্ত এবং মাদারীপুর-সাতক্ষীরা কাল্পনিক লাইন ছিলো দক্ষিণ সীমান্ত। ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর ৯ নং সেক্টরে অন্তর্ভুক্ত হয়।
খ) সাব-সেক্টরের সংখ্যাঃ ৭।
গ) সেক্টরবাহিনী সদস্য সংখ্যাঃ ২,০০০।
ঘ) গেরিলা সংখ্যাঃ ৭,০০০।
ঙ) সেক্টর কমান্ডারঃ মেজর (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) এম. এ. মঞ্জুর।
(মেজর এম. এ. মঞ্জুর দায়িত্ব বুঝে নেয়ার আগে মেজর (পরবর্তীকালে, লেঃ কর্ণেল) এম. এ. ওসমান চৌধুরী এই সেক্টরে অভিযান পরিচালনা করেন।
৯ নং সেক্টরঃ

ক) এলাকাঃ সমগ্র বরিশাল, পটুয়াখালী ও খুলনা জেলা (সাতক্ষীরা বাদে), ফরিদপুর জেলার অংশ বিশেষ এবং গোপালগঞ্জ।
খ) সাব-সেক্টরের সংখ্যাঃ ৮।
গ) সেক্টরবাহিনী সদস্য সংখ্যাঃ ৭০০।
ঘ) গেরিলা সংখ্যাঃ ১০,০০০।
ঙ) সেক্টর কমান্ডারঃ ক্যাপ্টেন (পরবর্তীকালে, মেজর ) এম. এ. জলিল।
১০ নং সেক্টরঃ

এই সেক্টরের জন্য কোন এলাকা নির্দিষ্ট করা হয়নি। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এবং নৌ বাহিনীর কমান্ডোদের সমন্বয়ে এই সেক্টর তৈরি করা হয়েছিলো যাতে করে স্বাধীন এলাকাগুলোকে রক্ষা করা যায় এবং বাংলাদেশের অন্তর্বতীকালীন সরকার এই সকল এলাকায় প্রধান কার্যালয় স্থাপন করে কার্যμম চালিয়ে নিতে পারে। নৌ বাহিনী কমান্ডোদের বিভিনড়ব সেক্টরে পাঠানো হতো পাকিস্তানী নৌযান ধ্বংস ও বন্দর এলাকাগুলোয় আক্রমণ চালানোর জন্য। অভিযান পরিচালনার সময় কমান্ডোরা ওই এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডারদের তত্ত্বাবধানে ও পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করতেন। মিশন শেষে তারা ফিরে এসে ১০ নং সেক্টরের সদস্য হিসাবে অবস্থান করতেন।
১১ নং সেক্টরঃ

ক) এলাকাঃ কিশোরগঞ্জ মহকুমা বাদে সমগ্র ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলা। উত্তরে যমুনা নদীর তীরে বাহাদুরাবাদ ঘাট ও ফুলছড়িঘাট এই সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
খ) সাব-সেক্টরের সংখ্যাঃ ৮।
গ) সেক্টরবাহিনী সদস্য সংখ্যাঃ এক ব্যাটালিয়ন।
ঘ) গেরিলা সংখ্যাঃ ২০,০০০।
ঙ) সেক্টর কমান্ডারঃ মেজর (পরবর্তীকালে লেঃ কর্ণেল) এ. তাহের।

পরবর্তীকালে তিনটি রেগুলার আর্মি ব্রিগেড গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রত্যেক ব্রিগেডকেই 'ফোর্স' নামে অভিহিত করা হয়। এগুলো হলো, মেজর জিয়াউর রহমানের তত্ত্বাবধানে 'জেড' ফোর্স, মেজর কে. এম, শফিউল্লাহ্'র তত্ত্বাবধানে 'এস' ফোর্স এবং মেজর খালেদ মোশারফের তত্ত্বাবধানে 'কে' ফোর্স। 'কে' ফোর্স গঠন করা হয় ২ নং সেক্টরে। মেজর খালেদ মোশারফ সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালনের সাথে এই ফোর্সেরও নেতৃত্ব দেন।

'এস' ফোর্স গঠন করা হয় ৩ নং সেক্টরে। মেজর কে. এম. শফিউল্লাহ্ সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালনের সাথে এই ফোর্সেরও নেতৃত্ব দেন।'জেড' ফোর্স মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিলেট ও ময়মনসিংহের জেলার উত্তরে ভারত সীমান্ত এলাকায় এই ফোর্স গঠন করা হয়। মেজর জিয়াকে কোন সেক্টরের দায়িত্ব দেয়া হয়নি। তিনি শুধুমাত্র 'জেড'ফোর্সের কমান্ডার ছিলেন। অন্যদিকে, মেজর কে. এম. শফিউল্লাহ্ (৩ নং সেক্টর এবং 'এস' ফোর্স) এবং মেজর খালেদ মোশারফ ( ২ নং সেক্টর এবং 'কে' ফোর্স) ছিলেন একইসাথে সেক্টর ও ফোর্স কমান্ডার।

সেক্টর সমূহের সীমানা নির্ধারণ ও কমান্ডার নিয়োগের পর সেনাবাহিনী, ইপিআর ও পুলিশবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে একটি নতুন নিয়মিত যোদ্ধা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে একটি গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলার ব্যাপারে দীর্ঘ আলোচনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অসামরিক জনগণের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাসেবকদের অল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে এক বিশাল গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। 'আক্রমণ কর, সরে পড়'- এই কৌশল অবলম্বন করে গেরিলারা সারাদেশব্যাপী পাকিস্তানীদের উপর আক্রমণ চালাতে থাকবে। প্রতিদিন এমনি অসংখ্য ছোট-বড় আক্রমণে পাকিস্তানিদের হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলবে, তাদের লোকক্ষয় হতে থাকবে অব্যাহতভাবে এবং ক্রমান্বয়ে ভেঙ্গে পড়তে থাকবে তাদের মনোবল। এমনি করে আঘাতের পর আঘাতে পর্যদুস্ত ও মনোবল ভেঙ্গে পড়া পাকিস্তানী সৈন্যদের উপরে সঠিক সময়ে বিদ্যুৎগতির ক্ষিপ্র ও তীব্র, স্বল্প মেয়াদি আক্রমণ পরিচালনা করলে যুদ্ধের মাঠে তাদের পরাজয় অনিবার্য - এটাই ছিলো চূড়ান্ত রণকৌশল। পনের জুলাই সন্ধ্যায় সেক্টর কমান্ডার ও ফোর্স কমান্ডারগণ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। সেখানে অবশ্য কোন প্রকার মত বিনিময় বা সেক্টর সমূহের পরিস্থিতি নিয়ে কোন আলোচনা হয়নি। এটি ছিলো কেবলই শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতামাত্র। সেক্টর এবং ফোর্স কমান্ডারগণ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির নিকট শপথ গ্রহণ করেন এবং আনুষ্ঠানকিভাবে বাংলাদেশ সরকারে প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। সেক্টর কমান্ডার এবং তিনটি ফোর্সের কমান্ডারগণ নিয়োগ লাভ করেছিলেন বাংলাদেশ সরকারের নিকট থেকে। সাব-সেক্টর কমান্ডারগণের নিয়োগ বাংলাদেশ সরকার কিংবা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে দেয়া হয়নি। তারা নিয়োগ লাভ করেছিলেন স্ব-স্ব সেক্টর কমান্ডারগণের কাছ থেকে।

সেক্টর কমান্ডার এবং তিনটি ফোর্সের কমান্ডারগণ নিয়োগ লাভ করেছিলেন বাংলাদেশ সরকারের নিকট থেকে। সাব-সেক্টর কমান্ডারগণের নিয়োগ বাংলাদেশ সরকার কিংবা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে দেয়া হয়নি। তারা নিয়োগ লাভ করেছিলেন স্ব-স্ব সেক্টর কমান্ডারগণের কাছ থেকে।

স্বাক্ষর - দাতাগণঃ- ( আগস্ট-২০০৮ ইং)

এয়ার ভাইস মার্শাল (অবঃ) এ. কে. খন্দকার, বীর উত্তমঃ ডেপুটি চীফ অব স্টাফ, বাংলাদেশ ফোর্সেস।
মেজর জেনারেল (অবঃ) কে. এম. শফিউল্লাহ্, বীর উত্তমঃ ৩ নং সেক্টর ও 'এস' ফোর্সের কমান্ডার।
মেজর জেনারেল (অবঃ) সি. আর. দত্ত, বীর উত্তমঃ ৪ নং সেক্টর কমান্ডার।
লেঃ জেনারেল (অবঃ) মীর শওকত আলী, বীর উত্তমঃ ৫ নং সেক্টর কমান্ডার।
লেঃ কর্ণেল (অবঃ) কি. এন. জামানঃ ৭ নং সেক্টর কমান্ডার (মেজর নাজমুলের মৃত্যুর পর)।
মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম, বীর উত্তমঃ ১ নং সেক্টর কমান্ডার।
নিম্নোক্ত ফোর্স ও সেক্টর কমান্ডারগণ আগেই মৃত্যুবরণ করেছেনঃ

লেঃ জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীর উত্তমঃ 'জেড' ফোর্স কমান্ডার।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ, বীর উত্তমঃ ২ নং সেক্টর ও 'কে' ফোর্সের কমান্ডার।
এয়ার ভাইস মার্শাল এম. কে. বাশার, বীর উত্তমঃ ৬ নং সেক্টর কমান্ডার।
মেজর জেনারেল এম. এ. মঞ্জুর, বীর উত্তমঃ ৮ নং সেক্টর কমান্ডার।
মেজর এম. এ. জলিলঃ ৯ নং সেক্টর কমান্ডার।
কর্ণেল (অবঃ) এ. তাহের, বীর উত্তমঃ ১১ নং সেক্টর কমান্ডার


Share with :

Facebook Twitter